জানতে হবে, জানাতে হবে ওদের দূরে রাখাই সমাধান নয়

শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা, রাজধানীর রমনা পার্ক। শহরের যান্ত্রিকতার ভিড়ে হা-পিত্যেশ করা মানুষ ছুটির দিনগুলোতে এই পার্কে এসে কিছুটা সময় কাটাতে চায়। পার্কের ভেতরে এখানে ওখানে মানুষের জটলা, সবাই যে যারমতো ব্যস্ত। অনেকক্ষণ অপেক্ষার পর একটু দূর থেকে কাক্সিক্ষত শব্দ ভেসে আসে। শব্দকে অনুসরণ করে সেদিকে পা বাড়াই, রাস্তার পাশেই বসে আছে তিন কিশোর। দেখে বোঝা গেল ওরা সবেমাত্র স্কুলের গ-ি পেরিয়েছে। একটু দূরত্ব রেখে তাদের পর্যবেক্ষণ করি। তাদের কথা বলার ধরন দেখে নিশ্চিত হবার চেষ্টা করি, এরই মধ্যে একজন এসে হাত বাড়িয়ে দেয়, ‘আমি নিশান (ছদ্মনাম), আপনি কাউকে খুঁজছেন?’ সাড়া পেয়ে নিজেকে এনজিওকর্মী পরিচয় হিসেবে পরিচয় দিই। ওদের সঙ্গে একান্তে কথা বলার আগ্রহ প্রকাশ করি। উত্তরের ছেলেটি জানায়, ‘এখানে তো কথা বলা যাবে না। আপনি আধঘণ্টা পর পার্কের সামনে আসেন, আমি সেখানে আসব। তারপর না হয় কোথাও বসব।’ সম্মতি জানিয়ে কিশোরকে বিদায় দিয়ে চলে আসি।

বঞ্চনার সঙ্গে যোগ হয়েছে স্বাস্থ্যঝুঁকি
রাত সাড়ে ৮টা, কিশোরকে সঙ্গে নিয়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ফাঁকা জায়গায় বসে আবারো পরিচয় পর্ব সেরে নেই। এরই মধ্যে বেশকিছু শর্তও দেয় নিশান (ছদ্মনাম)। বক্তব্য রেকর্ড করা, ছবি তোলা, সঠিক নাম পরিচয় জানতে চাওয়া যাবে না। সেই সঙ্গে কাথাও লেখা প্রকাশের আগে দেখিয়ে নেয়ার ব্যাপারেও জোর দেয়। এরপর বলতে শুরু করে নিশান, ‘আমি অন্য দশজনের মতোই একজন মানুষ। আমিও স্বপ্ন দেখি, আমারও সুখ-দুঃখের অনুভূতি আছে। তারপরও সমাজের কিছু কিছু মানুষ আমাদের ভিন্নভাবে দেখে। কিন্তু আমরা আসলে ভিন্ন নই, শুধু আমার পছন্দের জায়গাটি ভিন্ন। আপনার হয়তো মেয়েদের সঙ্গে মিশতে ভালো লাগে, আর আমার ছেলেদের সঙ্গ পছন্দ। সাধারণত মানুষের আগ্রহ থাকে বিপরীত লিঙ্গের প্রতি, কিন্তু আমি সমলিঙ্গের সঙ্গেই মিশতে চাই। আমাদের মানুষ ঘৃণাভরে ‘সমকামী’ বলে। কিন্তু এখানে শুধু কাম নয়, প্রেমের বিষয়টি মুখ্য। তাই আমরা বলি ‘সমপ্রেম’। আমরা সমাজের অন্যদের সঙ্গে মিশতে পারি না। তাই নিজেদের মতো করে একটা জগৎ তৈরি করে বেঁচে থাকার চেষ্টা করি।’

কথাগুলো বলতে বলতে কণ্ঠ ভারী হয়ে ওঠে তার। বুঝতে শেখার পর থেকে পদে পদে যন্ত্রণা আর বঞ্চনার জীবনের বোঝা এই কিশোরের সহ্যশক্তির তুলনায় অনেক অনেকগুণ ভারী। অপরাধী না হলেও সমাজের মানুষের চোখ ফাঁকি দিয়ে ওদের প্রত্যেকটি পা ফেলতে হয়। অথচ ভিন্ন যৌনাচরণের জন্য সে দায়ী নয়, প্রকৃতির অমোঘ খেয়ালে আর দশজনের তুলনায় তার বিশেষ পছন্দটি ভিন্ন। বিশ্বের অন্য দেশগুলো ভিন্ন ভিন্ন যৌন আচরণ ইস্যুতে বেশ উদার, তারা যৌনতা বা যৌন পছন্দ-অপছন্দ নয় বরং মনুষ্যত্বের ভিত্তিতে সবকিছু বাছ-বিচার করে। কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট ভিন্ন, এখানে সমাজ ওদের একঘরে করে রাখে। ওরা জীবিকার জন্য কাজ পায় না, বঞ্চিত হয় শিক্ষার অধিকার থেকেও। জীবন ও জীবিকার প্রয়োজনে এই জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশ যৌন ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে পড়তে বাধ্য হয়। অথচ সামাজিক প্রতিবন্ধকতার কারণে তাদের ঝুঁকিপূর্ণ যৌন আচরণ, যৌনবাহিত রোগের ঝুঁকিসহ বেশকিছু দিক রয়ে যায় আলোচনার অন্তরালে। অথচ সমপ্রেমী জনগোষ্ঠীর অনিরাপদ যৌন আচরণের কারণে প্রাণঘাতী এইচআইভি/এইডস রোগের ঝুঁকি বাড়ছে। সেই সঙ্গে যৌনবাহিত আরো প্রায় ২০ ধরনের রোগে আক্রান্ত হচ্ছে পিছিয়ে পড়া এই জনগোষ্ঠী।

বছরখানেক আগে মাধ্যমিকের গ-ি পেরুনো নিশানের ভাষায়, “শিক্ষা, কর্ম ও স্বাধীনভাবে জীবনধারণের অধিকার না থাকার কারণে সমকামীদের মধ্যে অনেকেই যৌন ব্যবসা করে। এটা করেই তারা জীবন চালায়, কারণ যৌনতার ক্ষেত্রে পছন্দ ভিন্ন হলেও ক্ষুধার তাড়না অভিন্ন। কিন্তু সমকামী যৌনকর্মীদের বেশির ভাগেরই ঝুঁকিপূর্ণ যৌন আচরণ সম্পর্কে তেমন কোনো ধারণা নেই। তাই নিজেদের অজান্তেই সমকামীরা বিভিন্ন যৌনবাহিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। আবার তারা যাদের সঙ্গে মিশছে, তাদের মধ্যে মাদকাসক্তরাও রয়েছে। একইভাবে ঝুঁকিপূর্ণ যৌন আচরণ যে সমপ্রেমীদের জীবনও বিপন্ন করে তুলতে পারে, সে বিষয়েও অনেকে সচেতন নয়। এভাবে অনিরাপদ যৌন সম্পর্কের কারণে বিভিন্ন সংক্রামক রোগ একজন থেকে আরেকজনের শরীরের সংক্রমিত হচ্ছে। কিন্তু সমকামীদের পক্ষে এসব রোগ নিয়ে কোনো স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গিয়ে চিকিৎসা করানো কঠিন। চিকিৎসকরা সবকিছু জানার পর ‘খারাপ’ মনে করে চিকিৎসাও করতে চান না। আবার আমরা চাইলেও অন্য কারো সঙ্গে শেয়ার করতে পারি না। অথচ আমরা সুস্থ ও স্বাভাবিকভাবে বাঁচতে চাই, সেই অধিকার তো আমাদের আছে। কিন্তু ‘সেক্সুয়াল ওরিয়েন্টেশন’ ভিন্ন বলে আমরা স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রেও বৈষম্যের শিকার হচ্ছি।”

চিকিৎসকদের মতে, সমকামীদের যৌন আচরণের কারণে তারা অত্যন্ত নাজুক পরিস্থিতির মধ্যে থাকে। অ্যানাল ও ওরাল সেক্সে অভ্যস্ততার কারণে তারা বিভিন্ন ধরনের যৌনবাহিত রোগ এমনকি এইচআইভি/এইডসের ঝুঁকির মধ্যে বসবাস করে। সবচেয়ে আশঙ্কার বিষয় হচ্ছে, তাদের চিহ্নিত করা যায় না। তারা বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হলেও সেটা প্রকাশ করে না। আর এই জনগোষ্ঠীর একটি উল্লেখযোগ্য অংশই রাতের বেলা রাস্তায় নামে, যেখানে স্বল্প আয়ের রিকশাচালক ও কুলি-মজুর শ্রেণি তাদের ক্লায়েন্ট। যাদের যৌনরোগ কিংবা অনিরাপদ যৌন আচরণ বিষয়ে কোনো শিক্ষা থাকে না। তাই এইচআইভি/এইডসের মতো রোগপ্রতিরোধে যৌন সংখ্যালঘুদের ঝুঁকিপূর্ণ যৌন আচরণ বিষয়ে সচেতন করার বিকল্প নেই। ওদের ঘৃণা করে দূরে ঠেলে দেওয়াই সমাধান নয়। বরং তাতে অবস্থার আরো অবনতি হবে। এ জন্য যৌন সংখ্যালঘুদের সম্পর্কে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে।
আঁধার কাটছে, তবুও…

আশার কথা হলো, বিশ্বব্যাপী গ্লোবাল ফান্ডের সহায়তায় এইআইভি/এইডস প্রতিরোধে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর অধিকার ও স্বাস্থ্য সচেতনতা নিয়ে ন্যাশনাল এইডস/এসটিডি প্রোগ্রামের অধীনে কয়েক বছর ধরেই সচেতনতামূলক কার্যক্রম চলছে। প্রকল্পের মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর অবসর বিনোদন, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ও সচেতনতার জন্য দেশজুড়ে ড্রপ ইন সেন্টারের (ডিআইসি) ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। সমকামী ও সমপ্রেমীদের ঝুঁকিপূর্ণ যৌন আচরণ ও বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি সম্পর্কে আলাপকালে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘বন্ধু’র প্রোগ্রাম ম্যানেজার উম্মে ফারহানা জারিফ কান্তা বলছিলেন, ‘সমকামিতা নিয়ে কথা বলার মতো পরিবেশ নেই। আমাদের সামাজিক ও ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি সমকাম বা সমপ্রেম যেভাবেই বলি এই বিষয়টিকে সমর্থন করে না। তাই সমকামী ও সমপ্রেমীরা নিজেদের স্বাস্থ্যগত দিকগুলো সম্পর্কে জানতে পারে না। পাশাপাশি শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার কারণে তারা ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন নয়। আবার তারা ছোট-বড় রোগে আক্রান্ত হলেও চিকিৎসা নিতে যায় না। আমাদের দেশে যৌন সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর জন্য চিকিৎসার উপযুক্ত পরিবেশও গড়ে ওঠেনি। পারিপার্শ্বিকতার কারণেই যৌন সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ যৌন আচরণের প্রবণতা বেশি। আর এই জনগোষ্ঠীর ঝুঁকিপূর্ণ যৌন আচরণ প্রাণঘাতী এইচআইভি/এইডসসহ যৌনবাহিত সংক্রামক রোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। আমরা চাইলে সমকামিতা বা সমপ্রেম বন্ধ করতে পারব না। তাই তারা যাতে নিজেরা নিরাপদ যৌন আচরণ করে এবং নিজের অজান্তেই অন্য কাউকে মারণব্যাধির দিকে ঠেলে না দেয়, সেজন্য আমরা জনসচেতনতা তৈরিতে কাজ করছি।’

যৌন সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষা ও এইচআইভি/এইডস প্রতিরোধে সচেতনতা বাড়াতে গ্লোবাল ফান্ডের অর্থায়নে কাজ করা বন্ধু সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার সোসাইটির নির্বাহী পরিচালক সালেহ আহমেদ বলছিলেন, ‘দেশে এইচআইভি/এইডস প্রতিরোধের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে অনিরাপদ যৌন আচরণ ও এর ভয়াবহতা সম্পর্কে সচেতন করে তুলতে হবে। তাহলে ঝুঁকিপূর্ণ যৌন আচরণ বন্ধ করে দেশের পরবর্তী প্রজন্মকে বড় ধরনের বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা করা সম্ভব হবে। এ জন্য সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করার পাশাপাশি যৌন সংখ্যালঘুদের জন্য উন্নত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা জরুরি। তারা এই সমাজেরই একটি অংশ, তাদের মূল স্রোতের বাইরে ফেলে রেখে দেশকে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। সবাইকেই বিষয়গুলো জানতে হবে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *