পুঁজিবাজারের বর্তমান দুর্দশার মুলেই রয়েছে অতিরিক্ত প্রিমিয়ামে অর্থ উত্তোলন

ipo
শেয়ারটাইম্‌স২৪ডটকম: ২০১০ সালের পুঁজিবাজার ধসের পরে ২০১১ থেকে আজ অবধি প্রায় ৮৪টি কোম্পানি ও মিউচ্যুয়াল ফান্ড প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে পুঁজিবাজার থেকে অর্থ উত্তোলন করেছে। এর মধ্যে ৩৯টি কোম্পানির প্রিমিয়ামের পরিমাণ ছিল সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকারও বেশি। এর মধ্যে ২০১১ সালে বিএসইসির অনুমোদন নিয়ে ৭ কোম্পানি ও ৭ মিউচ্যুয়াল ফান্ড এক হাজার ৯৯১ কোটি ৪১ লাখ অর্থ সংগ্রহ করে। এর মধ্যে প্রিমিয়াম ছিল এক হাজার ১১৮ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। ২০১২ সালে ১৬ কোম্পানি এক মিউচ্যুয়াল ফান্ড এক হাজার ২০৮ কোটি ১০ লাখ টাকা পুঁজি সংগ্রহ করে। এর মধ্যে প্রিমিয়াম ছিল ৭৭৩ কোটি ৫৩ লাখ টাকা। ২০১৩ সালে ১০ কোম্পানি দুই মিউচ্যুয়াল ফান্ড ৮৩০ কোটি ৫০ লাখ টাকা সংগ্রহ করে। এ বছর কোম্পানিগুলো প্রিমিয়াম নিয়েছিল ৩৯৮ কোটি টাকা। ২০১৪ সালে ২০ কোম্পানি বাজার থেকে অর্থ উত্তোলন করেছিল এক হাজার ২৬৩ কোটি ৬২ লাখ টাকা। এর মধ্যে কোম্পানিগুলো প্রিমিয়াম নিয়েছিল ৭১৭ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। ২০১৫ সালে ৯ কোম্পানি ও ৩ মিউচ্যুয়াল ফান্ড বাজার থেকে ৮৩০ কোটি ৭২ লাখ টাকা তুলেছিল। এরমধ্যে প্রিমিয়াম নিয়েছিল ৪৫৬ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। আর ২০১৬ সালে প্রিমিয়ামের পরিমাণ ছিল ৩৬ কোটি টাকা।

এছাড়াও তথ্য বিশ্লেষনে দেখা যায়, আলোচ্য সময়ে প্রিমিয়াম নিয়ে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর অধিকাংশই ইস্যুমূল্যের নিচে অবস্থান করছে। এ ধরনের কোম্পানিগুলো হল: মবিল যমুনা, এমআই সিমেন্ট, রংপুর ডেইরী, জাহিনটেক্স, বারাকা পাওয়ার, আমরাটেক, ইউনিক হোটেল, সায়হাম কটন, জিবিবি পাওয়ার, জিপিএইচ ইস্পাত, জিএসপি ফাইন্যান্স, এ্যাপোলো ইস্পাত, প্যারামাউন্ট টেক্সটাইল, ওরিয়ন ফার্মা, আর্গন ডেনিমস, হামিদ ফেব্রিক্স, ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ড, ফারইস্ট নিটিং, পেনিনসুলা, রিজেন্ট টেক্সটাইল এবং তশরিফা ইন্ডাস্ট্রিজ।

এরমধ্যে, ২০১১ সালে তালিকাভুক্ত হয় মবিল যমুনা, এমআই সিমেন্ট, রংপুর ডেইরী, জাহিনটেক্স, বারাকা পাওয়ার। ২০১২ সালে হয় আমরাটেক, ইউনিক হোটেল, সায়হাম কটন, জিবিবি পাওয়ার, জিপিএইচ ইস্পাত এবং জিএসপি ফাইন্যান্স। ২০১৩ সালে তালিকাভুক্ত হয় এ্যাপোলো ইস্পাত, প্যারামাউন্ট টেক্সটাইল, ওরিয়ন ফার্মা, আর্গন ডেনিমস। ২০১৪ সালে তালিকাভুক্ত হয় হামিদ ফেব্রিক্স, ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ড, ফারইস্ট নিটিং, পেনিনসুলা এবং ২০১৫ সালে তালিকাভুক্ত হয় রিজেন্ট টেক্সটাইল এবং তসরিফা ইন্ডাস্ট্রিজ।

জানা যায়, বিদ্যুৎ ও জ্বালানী খাতের কোম্পানি মবিল যমুনা ১০ টাকা ফেসভ্যালুর সাথে ১৪২ টাকা প্রিমিয়ামসহ ১৫২ টাকা ইস্যুমূল্যে তালিকাভুক্ত হলেও বর্তমানে কোম্পানিটির শেয়ারদর অবস্থান করছে ১০৬.৮০ টাকায়।

সিমেন্ট খাতের এমআই সিমেন্ট ফেসভ্যালুর সাথে ১০১ টাকা প্রিমিয়ামসহ ১১১ টাকা ইস্যুমূল্যে তালিকাভুক্ত হয়। বর্তমানে কোম্পানিটির শেয়ারদর অবস্থান করছে ৭৫.৫০ টাকায়।

রংপুর ডেইরী ১০ টাকার ফেসভ্যালুর সাথে ৮ টাকা প্রিমিয়ামসহ মোট ১৮ টাকা ইস্যুমূল্যে তালিকাভুক্ত হলেও বর্তমানে কোম্পানিটির শেয়ারদর অবস্থান করছে ১২.১০ টাকায়।

জাহিনটেক্স ১০ টাকা ফেসভ্যালুর সাথে ১৫ টাকা প্রিমিয়ামসহ ২৫ টাকা ইস্যুমূল্যে তালিকাভুক্ত হলেও বর্তমানে কোম্পানিটির শেয়ারদর অবস্থান করছে ২০.৮০ টাকায়।

বারাকা পাওয়ার ১০ টাকা ফেসভ্যালুর সাথে ৫০ টাকা প্রিমিয়ামসহ ৬০ টাকা ইস্যুমূল্যে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয়। বর্তমানে কোম্পানিটির শেয়ারদর অবস্থান করছে ২৮.৮০ টাকায়।

আমরাটেক ১০ টাকা ফেসভ্যালুর সাথে ১৪ টাকা প্রিমিয়ামসহ ২৪ টাকা ইস্যুমূল্যে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হলেও বর্তমানে কোম্পানিটির শেয়ারদর অবস্থান করছে ২৪.৪০ টাকায়।

ইউনিক হোটেল ১০ টাকা ফেসভ্যালুর সাথে ৬৫ টাকা প্রিমিয়ামসহ ৭৫ টাকা ইস্যুমূল্যে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হলেও বর্তমানে কোম্পানিটির শেয়ারদর অবস্থান করছে ৪৩.৯০ টাকায়।

সায়হাম কটন ১০ টাকা ফেসভ্যালুর সাথে আরো ১০ টাকা প্রিমিয়ামসহ ২০ টাকা ইস্যুমূল্যে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হলেও বর্তমানে কোম্পানিটির শেয়ারদর অবস্থান করছে ১২.৬০ টাকায়।

জিবিবি পাওয়ার ১০ টাকা ফেসভ্যালুর সাথে ৩০ টাকা প্রিমিয়ামসহ ৪০ টাকা ইস্যুমূল্যে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হলেও বর্তমানে কোম্পানিটির শেয়ারদর অবস্থান করছে ১৩.৭০ টাকায়।

জিপিএইচ ইস্পাত ১০ টাকা ফেসভ্যালুর সাথে ২০ টাকা প্রিমিয়ামসহ ৩০ টাকা ইস্যুমূল্যে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হলেও বর্তমানে কোম্পানিটির শেয়ারদর অবস্থান করছে ২৮.৪০ টাকায়।

জিএসপি ফাইন্যান্স ১০ টাকা ফেসভ্যালুর সাথে ১৫ টাকা প্রিমিয়ামসহ ২৫ টাকা ইস্যুমূল্যে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হলেও বর্তমানে কোম্পানিটির শেয়ারদর অবস্থান করছে ১৩.৪০ টাকায়।

এ্যাপোলো ইস্পাত ১০ টাকা ফেবভ্যালুর সাথে ১২ টাকা প্রিমিয়ামসহ ২২ টাকা ইস্যুমূল্যে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হলেও বর্তমানে কোম্পানিটির শেয়ারদর অবস্থান করছে ১৫.২০ টাকায়।

প্যারামাউন্ট টেক্সটাইল ১০ টাকা ফেসভ্যালুর সাথে ১৮ টাকা প্রিমিয়ামসহ ২৮ টাকা ইস্যুমূল্যে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হলেও বর্তমানে কোম্পানিটির শেয়ারদর অবস্থান করছে ১০.৬০ টাকায়।

ওরিয়ন ফার্মা ১০ টাকা ফেসভ্যালুর সাথে ৫০ টাকা প্রিমিয়ামসহ ৬০ টাকা ইস্যুমূল্যে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হলেও বর্তমানে কোম্পানিটির শেয়ারদর অবস্থান করছে ৩৭.০০ টাকায়।

আর্গন ডেনিমস ১০ টাকা ফেসভ্যালুর সাথে ২৫ টাকা প্রিমিয়ামসহ ৩৫ টাকা ইস্যুমূল্যে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হলেও বর্তমানে কোম্পানিটির শেয়ারদর অবস্থান করছে ২২.৪০ টাকায়।

এছাড়া হামিদ ফেব্রিক্স ১০ টাকা ফেসভ্যালুর সাথে ২৫ টাকা প্রিমিয়ামসহ ৩৫ টাকা ইস্যুমূল্যে তালিকাভুক্ত হলেও বর্তমানে কোম্পানিটির শেয়ারদর অবস্থান করছে ১৬.৪০ টাকায়।

ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ড ১০ টাকা ফেসভ্যালুর সাথে ২৫ টাকা প্রিমিয়ামসহ ৩৫ টাকা ইস্যুমূল্যে তালিকাভুক্ত হলেও বর্তমানে কোম্পানিটির শেয়ারদর অবস্থান করছে ২৩.২০ টাকায়।

ফারইস্ট নিটিং ১০ টাকা ফেসভ্যালুর সাথে ১৭ টাকা প্রিমিয়ামসহ ২৭ টাকা ইস্যুমূল্যে তালিকাভুক্ত হলেও বর্তমানে কোম্পানিটির শেয়ারদর অবস্থান করছে ২৩.৬০ টাকায়।

পেনিনসুলা ১০ টাকা ফেসভ্যালুর সাথে ২০ টাকা প্রিমিয়ামসহ ৩০ টাকা ইস্যুমূল্যে তালিকাভুক্ত হলেও বর্তমানে কোম্পানিটির শেয়ারদর অবস্থান করছে ১৫.২০ টাকায়।

রিজেন্ট টেক্সটাইল ১০ টাকা ফেসভ্যালুর সাথে ১৫ টাকা প্রিমিয়ামসহ ২৫ টাকা ইস্যুমূল্যে তালিকাভুক্ত হলেও বর্তমানে কোম্পানিটির শেয়ারদর অবস্থান করছে ১১.৭০ টাকায়।

এবং তসরিফা ইন্ডাস্ট্রিজ ১০ টাকা ফেসভ্যালুর সাথে ১৬ টাকা প্রিমিয়ামসহ ২৬ টাকা ইস্যুমূল্যে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হলেও বর্তমানে কোম্পানিটির শেয়ারদর ১৯.৮০ টাকায় অবস্থান করছে।

বাজারের এই দর পরিস্কার প্রমান করছে কোম্পানিগুলো প্রিমিয়ামে টাকা উত্তোলনের উপযুক্ত না হওয়া সত্বেও তাদেরকে সেই সুযোগ দেয়া হয়েছে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, পুঁজিবাজারের বর্তমান দুর্দশার মুলেই রয়েছে অতিরিক্ত প্রিমিয়ামে বাজার থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা সরিয়ে নেয়া। তাদের মতে, কোন কোম্পানির আইপিওতে প্রিমিয়াম দেয়া হলে অবশ্যই ওই কোম্পানির আর্থিক অবস্থা, সম্পদ, আয় ইত্যাদি বিবেচনায় নিয়ে অনুমোদন দেয়া উচিত। এর অন্যথা হলে প্রাথমিক শেয়ারেই বিনিয়োগকারীদের ক্ষতির ঝুঁকি থেকে যায়, যার নিশ্চিত প্রভাব পড়ে পুঁজিবাজারে। এমনিতেই দেশের দুই পুঁজিবাজার চরম আস্থার সংকটে ভুগছে। আর তাই অনিয়ম আর দুর্নীতির মাধ্যমে কোন দুর্বল কোম্পানি আইপিওর অনুমোদন পেলে এ প্রক্রিয়ায় জড়িতদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনা হবে, এমনটাই আশা করছেন তারা।
জানতে চাইলে পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদের সভাপতি মিজানুর রশীদ চৌধুরী বলেন, পুঁজিবাজারের জন্য যেমন কোম্পানির প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন বিনিয়োগকারীরও। আমরা মনে করি, পুঁজিবাজারে উভয়পক্ষের স্বার্থকেই সমান গুরুত্ব দেয়া উচিত। কিন্তু এ প্রত্যাশার সঙ্গে বাস্তবতার মিল নেই। আইপিওর মাধ্যমে একটি কোম্পানি তালিকাভুক্ত হয়ে থাকে। কোম্পানির পরিধি বিস্তার করার কথা বলে কোম্পানিগুলো উচ্চ হারে প্রিমিয়াম নেয়। কোম্পানির ব্যবসায়িক পরিধি বাড়ানোর পাশাপাশি ঋণ পরিশোধের জন্যও পুঁজিবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহ করে থাকে। আবার ব্যবসায়িক পরিধি বাড়ানোর কথা বলে অর্থ নেয়া হচ্ছে, কিন্তু পরবর্তীতে সেই অর্থ নির্ধারিত খাতে খরচ করা হচ্ছে না। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, পুঁজিবাজার থেকে উত্তোলিত অর্থ কোম্পানিগুলো কোন খাতে বিনিয়োগ করবে- এ বিষয়ে কোনো সুস্পষ্ট নীতিমালা নেই। তাই নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো তদারকির অভাবে কোম্পানিগুলো যে যেভাবে পারছে আইপিও’র অর্থ ব্যবহার করছে। তিনি বলেন, বিভিন্ন ইস্যু ম্যানেজার কোম্পানি অনেক ক্ষেত্রে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে আর্থিক প্রতিবেদন তৈরি করে। এভাবে অনেক প্রতিষ্ঠানই আইপিও অনুমোদন পায়। তিনি অভিযোগ করেন, বর্তমান সময়ে আর্থিক ভিত্তিহীন কোম্পানি বাজারে আসছে। এসব কোম্পানি কয়েক দিন পরই ওটিসিতে চলে যাবে বিনিয়োগকারীদের হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাট করে। ভালো কোম্পানির জন্য বিশেষ সুবিধা দিয়ে বাজারে নিয়ে আসতে হবে। নইলে যেসব কোম্পানি তালিকাভুক্ত হচ্ছে, তা আবারও বাজারে বড় পতন ঘটাতে পারে।
সিএসইর সাবেক প্রেসিডেন্ট ফখর উদ্দীন আলী আহমেদ বলেন, ২০১০ সালের ধস পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সময়ে বাজারে আশার আলো দেখা দিয়েছিল। কিন্তু তা নিভে যেতেও খুব বেশী সময় লাগে নি। কারণ, একদিকে কারসাজি চক্রের দৌরাত্ম, অন্যদিকে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের মুনাফা তুলে নেওয়ার প্রবণতায় সাধারণ বিনিয়োগকারীরা টিকে থাকতে পারে নি। পরিণতিতে বার বার ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। তবে শুধুমাত্র এসব কারণেই যে বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তা কিন্তু নয়। বরং কোন কোম্পানির আর্থিক অবস্থার বিশ্লেষন না করে সেসব কোম্পানিকে বাড়তি সুযোগ দিয়ে বাজারে নিয়ে আসার অযৌক্তিক প্রবনতাও বাজারেকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।