শেফার্ড ইন্ডাস্ট্রিজের জালিয়াতি : আর্থিক হিসাবে গড়মিল

sheferd
শেয়ারটাইম্‌স২৪ডটকমঃ দুর্বল আর্থিক ভীত, জালিয়াতি ও অস্বচ্ছতা নিয়ে পুঁজিবাজারে প্রবেশ করছে শেফার্ড ইন্ডাস্ট্রিজে। শেফার্ড ইন্ডাস্ট্রিজ মুনাফা ও সম্পদ বেশি দেখিয়ে শেয়ারবাজারে আসার চেষ্টা করছে। এ ছাড়া কোম্পানিটিতে আইনভঙ্গসহ নানা অসঙ্গতি রয়েছে।

হিসাববিদদের মতে, বিএএস-৩৬ অনুযায়ি যেকোনো প্রতিষ্ঠানের ইমপেয়ারম্যান্ট লস হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু কোম্পানিগুলো তা না করে সম্পদ ও মুনাফা বেশি দেখায়। এ ক্ষেত্রে শেফার্ড ইন্ডাস্ট্রিজও এর ব্যতিক্রম না। কোম্পানিটিও সম্পদ এবং মুনাফা বেশি দেখিয়ে আসছে। যার প্রমাণ পাওয়া গেছে স্থায়ী সম্পদ বিক্রয়ের ক্ষেত্রে।

কোম্পানিটি ২০১৬ সালের এপ্রিল-জুনে ৬ লাখ টাকার মটর যানবাহন বিক্রয় করেছে। যে মটর যানবাহন ৮.১৪ লাখ টাকা হিসাবে সম্পদ দেখিয়ে আসছিল। অর্থাৎ সম্পদ বেশি দেখিয়ে আসছিল। এসব সম্পদের ক্ষেত্রে ইমপেয়ারম্যান্ট লস দেখাতে হয়। যাতে ব্যয় বেড়ে মুনাফা কম হয়। একইসঙ্গে সম্পদের প্রকৃত চিত্র থাকে। কিন্তু তা না করে শেফার্ড ইন্ডাস্ট্রিজ সম্পদ ও মুনাফা বেশি দেখায়। এই কোম্পানিটিই আবার বলেছে ইমপেয়ারম্যান্ট লস হয়নি।
প্রাচীর, ফ্যাক্টরির ভিতরে রাস্তা, পার্কিং প্লেস, বাগান ইত্যাদি ল্যান্ড ডেভোলপমেন্ট। এসব সম্পত্তির নির্দিষ্ট আয়ুস্কাল আছে। যে কারণে বিএএস-১৬ অনুযায়ী, ল্যান্ড ডেভোলপমেন্ট অবচয়যোগ্য সম্পদ। কিন্তু শেফার্ড ইন্ডাস্ট্রিজ এ সম্পদের ওপর অবচয় চার্জ না করে সম্পদ ও মুনাফা বেশি দেখিয়ে আসছে।

বিএসইসি’র সাবেক অফিস অব দ্য চীফ অ্যাকাউন্টেন্ট, কনসালটেন্ট মো. মনোয়ার হোসেন (এফসিএমএ, সিপিএ, এফসিএ, এসিএ) বলেন, অ্যাকাউন্টিং স্টান্ডার্ড অনুযায়ী অবশ্যই ল্যান্ড ডেভোলপমেন্টের ওপর অবচয় চার্জ করতে হবে। অন্যথায় মুনাফা ও সম্পদ বেশি দেখানো হবে। যা বিনিয়োগকারীদের মাঝে ভুল তথ্য প্রদান করা হবে।
ব্র্যাক ইন্টারন্যাশনালের সাবেক হেড অব ইন্টারনাল অডিট সামসুর রহমান (এফসিএমএ) বলেন, প্রাচীর, ফ্যাক্টরির ভিতরে রাস্তা, পার্কিং প্লেস, বাগান ইত্যাদি ল্যান্ড ডেভোলপমেন্ট সম্পদ। এসব সম্পদ কখনো ভবনের সাথে যুক্ত হতে পারে না।

এ সময় তিনি আরো বলেন, ইমপেয়ারম্যান্ট লস হওয়ার মতো সম্পদ না থাকলে ৮ লাখ ১৪ হাজার টাকার মটর যানবাহনে ২ লাখ ১৪ হাজার টাকা বা ২৬ শতাংশ লোকসান হওয়া তো সম্ভব না। প্রকৃতপক্ষে কোম্পানিগুলো মুনাফা বেশি দেখানোর জন্য ইমপেয়ারম্যান্ট লস দেখায় না।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) করপোরেট গভর্নেন্স ফাইন্যান্সিয়াল বিভাগের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে বলেন, যেকোন কোম্পানির ক্ষেত্রে ইমপেয়ারমেন্ট লস হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু কোম্পানিগুলো গতানুগতিকভাবে তা না করে মুনাফা ও সম্পদ বেশি দেখিয়ে থাকে।

প্রসপেক্টাসের ২২৭ পৃষ্টায় ভুল ইপিএস দেখিয়ে আইপিও অনুমোদন পেয়েছে শেফার্ড ইন্ডাস্ট্রিজ। এখানে কোম্পানি কর্তৃপক্ষ ইপিএস বেশি ও ভুলভাবে উপস্থাপন করেছে।

দেখা গেছে, ২০১৬ সালের (এপ্রিল-জুন) ব্যবসায় ইপিএস হিসাবে ১.৬০ টাকা ও (এপ্রিল ১৫-মার্চ ২০১৬) ব্যবসায় ৪৩৬.৭০% দেখানো হয়েছে। যদিও ইপিএস যথাক্রমে ০.৪৬ টাকা ও ৪.৩৭ টাকা হয়েছে। যা ২৩৭ পৃষ্টায় উল্লেখ আছে।
শেফার্ড ইন্ডাস্ট্রিজের মুনাফা অর্ধেকে নেমে এসেছে। প্রতিষ্ঠানটি ২০১৬ সালের (এপ্রিল-জুন) সময়ে ৪.৮২ কোটি টাকা মুনাফা বা ০.৪৫ টাকা ইপিএস করেছে। কিন্তু পরবর্তী ৩ মাসে (জুলাই-সেপ্টম্বর) এ মুনাফা হয়েছে ২.১৯ কোটি বা ০.২১ টাকা ইপিএস। এ হিসাবে মুনাফা কমেছে ৫৪ শতাংশ।

কোম্পানিটির ক্যাশ ফ্লো নাজুক অবস্থা। কোম্পানিটি ৩ মাসে (এপ্রিল-জু) অপারেটিং ক্যাশ ফ্লো হয়েছে ৮৬ লাখ টাকা বা প্রতিটি শেয়ারে ০.০৮ টাকা হয়েছে। এ হিসাবে ১২ মাসে আসে০.৩২ টাকা। অর্থাৎ কোম্পানিটির নগদ লভ্যাংশ প্রদানের সক্ষমতা নাই। কারণ ১০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দিতে গেলেও লাগবে ১ টাকা। এ ছাড়া ঋণ পরিশোধ তো আছেই।
১০৪ কোটি টাকার মূলধনের কোম্পানিটি চলতি বছরের ১৪ ফেব্রুয়ারি ৮৫ কোটি টাকার শেয়ার ইস্যু করেছে। অর্থাৎ মোট মূলধনের ৮২ শতাংশই এসেছে এ বছর। ৮ মাস পার হয়ে গেলেও যার কোনো প্রভাব ব্যবসায় নেই। এমতাবস্থায় আবার কোম্পানিটি শেয়ারবাজার থেকে ২০ কোটি টাকা সংগ্রহ করতে যাচ্ছে।

শেফার্ড ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড ২০১৫ সালের ১ এপ্রিল শেফার্ড ইয়ার্ন লিমিটেডের সাথে একীভুতকরণ হয়েছে। এ সময় শেফার্ড ইয়ার্নের শেয়ারপ্রতি সম্পদ ছিল ৪৮১.৯১ টাকা ও শেফার্ড ইন্ডাষ্ট্রিজের ছিল ১০৬১.৬৯ টাকা। এমতাবস্থায় শেফার্ড ইয়ার্নের একীভুতকরণের পূর্বের ১০ কোটি ২৬ লাখ টাকার শেয়ারই প্রদান করা হয়েছে। যাতে একীভুতকরণের পরে শেফার্ড ইন্ডাস্ট্রিজের শেয়ারপ্রতি সম্পদ কমে এসেছে।

শ্রমিকদের সাথে নিয়মিত প্রতারণা করছে শেফার্ড ইন্ডাস্ট্রিজ, এমন অভিযোগও রয়েছে। একইসঙ্গে শ্রমিক আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছে। কোম্পানিটি ২০০৬ সালের বাংলাদেশ শ্রম আইনানুযায়ী, নীট আয়ের ৫শতাংশ হারে ফান্ড গঠন এবং বিতরণ কোনোটাই করছে না। ফলে শ্রমিকরা তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

শেফার্ড ইন্ডাস্ট্রিজ দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা করলেও শুধুমাত্র অভিহিত মূল্যে শেয়ারবাজারে আসছে। কোম্পানিটি ২ কোটি সাধারণ শেয়ার ছেড়ে ২০ কোটি টাকা সংগ্রহ করতে চায়। এক্ষেত্রে শুধুমাত্র ১০ টাকা অভিহিত মূল্যে শেয়ার ইস্যু করা হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও শেয়ারবাজার বিশেষজ্ঞ আবু আহমেদ বলেন, এখন কোম্পানিগুলো ইস্যু ম্যানেজারদের সহযোগিতায় বিনিয়োগকারীদের সাথে প্রতারণা করছে। কোম্পানিতে কিছু না থাকলেও তারা সুন্দর করে আর্থিক প্রতিবেদন তৈরি করে। এমন কোম্পানির আইপিও অনুমোদনে বিএসইসির সতর্ক হওয়া দরকার।

শেফার্ড ইন্ডাস্ট্রিজের ওয়েবসাইটে কোম্পানিটির শেফার্ড টেক্সটাইল ও তাইওয়ান ফুড অ্যান্ড প্রসেসিং ইন্ডাস্ট্রিজ নামে ২টি সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠান আছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে প্রসপেক্টাসের ৪৯ পৃষ্ঠায় কোনো সাবসিডিয়ারি কোম্পানি নেই বলে উল্লেখ রয়েছে। একই বিষয়ে দুই জায়গায় দুই ধরনের তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করছে শেফার্ড কর্তৃপক্ষ।
শেফার্ড ইন্ডাস্ট্রিজের চলতি বছরের ৩০ জুন প্রতিটি শেয়ারে সম্পদ (এনএভিপিএস) দাড়িয়েছে ১৮.৭০ টাকায়। তবে এই সম্পদ আইপিও পরবর্তীতে কমে আসবে ১৭ টাকায়। অর্থাৎ বিনিয়োগকারীরা ১৮.৭০ টাকা দেখে বিনিয়োগ করলেও মালিকানা পাবে ১৭ টাকার।

উল্লেখ্য উত্তোলিত ২০ কোটি টাকা দিয়ে কোম্পানিটির ওয়াশিং প্লান্ট ভবন নির্মাণ, সম্প্রসারণ, মেশিন ও সরঞ্জামদি ক্রয়, ইটিপি সম্প্রসারণ, ব্যাংক ঋণ পরিশোধ এবং আইপিও খাতে ব্যয় করা হবে।